
জানা গেছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে মোট ২৯৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকার পাট রফতানি হয়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৩০৭ কোটি ৬ লাখ, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩৫৪ কোটি ২৪ লাখ, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৪৩১ কোটি ১১ লাখ এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৬৫২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত পাঁচ অর্থবছরে পাটের রফতানি আয় ১১৮ শতাংশ।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো আবার চালু করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। অঙ্গীকার পূরণে সরকারি মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি পাটকল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ পাঁচটি পাটকল চালু করতে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সরকারের কাছে মোট ১৭২ কোটি টাকা চেয়েছিল। এর মধ্যে দুটি সরকারি পাটকল চালুর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রায় ১০৫ কোটি টাকা ছাড় করেছে। পাটকল দুটির মেশিনারি কেনার জন্য এ অর্থ ব্যয় হবে। পাট ও বস্ত্র সচিব আশরাফুল মকবুল সমকালকে জানান, দিন দিন পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসছে। পাটচাষিরা দু'তিন বছর ধরে পাটের ন্যায্য দাম পাওয়ায় তারাও পাটচাষে উৎসাহী হয়ে উঠছেন। বিশ্বজুড়ে পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি খাতে আয় বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি মালিকানাধীন পাটকলগুলো চালুর সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। পাট সচিব আশরাফুল মকবুল বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট ক্রয় করা হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ লাখ বেল। আমরা ক্রয় করেছি ৯ লাখ ২৯ হাজার বেল। পাট উৎপাদনকারী কৃষকরাও এ সময় ভালো দাম পেয়েছেন। ২০০৯ সালে প্রতি মণ পাটের দাম ছিল ২ হাজার ৭১৯ টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৯৬ টাকা। কৃষক পাটের ভালো দাম পাওয়ায় তারা এখন পাটচাষে উৎসাহী হয়ে উঠছেন। তিনি বলেন, পাট রফতানির পাশাপাশি এ সময় দেশে কর্মসংস্থানও বেড়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট ৫৯ হাজার ৪৫৪ জন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৭৯২ জনে। অর্থাৎ মোট ২১ শতাংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম তন্তু বা সিনথেটিক পণ্য নিষিদ্ধ হচ্ছে আর প্রাকৃতিক আঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। আমরা এ সম্ভাবনাকে সামনে রেখে পাটকলগুলোকে আবার সচল করার উদ্যোগ নিয়েছি। আদমজী পাটকল আবার চালু করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে পাট সচিব জানান, আমরা কত বড় ভুল করেছি সেটা বুঝতে আরও কিছুদিন লাগবে। তবে আদমজী পাটকলকে আগের পর্যায়ে চালু করা সম্ভব হবে না হয়তো, তবে বিষয়টি সরকার ভাবছে। পাটের বহুমুখী ব্যবহারের বিষয়েও সরকার ভাবছে। পাট থেকে কাগজের মণ্ড বানানোর বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পাকশী পেপার মিলে কাগজের মণ্ড তৈরির ইউনিটটি কাজে লাগানো হবে। পাট থেকে কাগজের মণ্ড তৈরি হলে বিদেশ থেকে কাগজ আমদানির নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি পাটের ব্যবহার বাড়বে। পাটের চাহিদা বাড়ানো গেলে কৃষকরাও পাটচাষে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। পাট সচিব বলেন, খুব শিগগিরই উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল মিয়ানমার ও চীন সফরে যাবে। সেখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশেই পাট থেকে মণ্ড উৎপাদনের কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে এরই মধ্যে পাটের প্যাকেজিং সামগ্রী আইন-২০১০ অনুমোদন করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, পণ্য সরবরাহ ও পরিবহন করা যাবে না। বিশেষ করে খাদ্যশস্য, চিনি, সার, সিমেন্ট প্যাকিংয়ে পাট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে দেশে উৎপাদিত পাটের ৫০ শতাংশ প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহার হবে। এছাড় মণ্ড উপাদনেও বিপুল পরিমাণ পাট ব্যবহার হবে। সোনালি আঁশ পাট নিয়ে চলছে নানা ধরনের গবেষণা। 'স্টাইল অ্যান্ড ডিজাইন মেকস দ্য সেল' এ স্লোগান ধারণ করে বিভিন্ন সংস্থা পাট পণ্যের বহুমুখীকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পাট দিয়ে বস্তা, চট, কারপেট, ব্যাগসহ সনতানী নানা পণ্য প্রস্তুতের পাশাপাশি এখন তৈরি হচ্ছে ফাইবার, ইয়ার্ন ও ফেব্রিক্স জাতীয় শতাধিক পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে কাগজ, কাগজের তৈরি বিভিন্ন পণ্য, জুট কম্পোজিটস, নন-ওভেন প্রডাক্টস উইপস, মেডিকেয়ার টেক্সটাইলস, বন্ডিং মেটেরিয়ালস, সেলুলোজ, সিটস, প্যানেলস, ফ্লোর টাইলস, ফাইনার ইয়ার্ন, ডায়েড ইয়ার্ন, কোটেট ইয়ার্ন, ফেন্সি ইয়ার্ন, মাল্টি প্লায়েড ইয়ার্ন, জুতা, স্যান্ডেল, গিফট বক্স, সেমিনার ব্যাগ, ফোল্ডারসহ বিভিন্ন পণ্য। এছাড়াও জাপান, আমেরিকা ও জার্মানে উৎপাদিত গাড়িতে পাট থেকে তৈরি পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পণ্য পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে। অর্থাৎ পাট আবার তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাচ্ছে।
Source: Daily Samakal, January-2011